রাজশাহী মহানগরীর সাহেববাজারের স্বর্ণপট্টিতে জুয়েলারি দোকানে চুরির ঘটনায় সংঘবদ্ধ চক্রের সাত সদস্য ও চোরাই স্বর্ণ কেনার অভিযোগে এক ব্যবসায়ীসহ মোট আটজনকে গ্রেপ্তার করেছে রাজশাহী মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে একজনকে খুলনা এবং অপর সাতজনকে ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পুলিশের দাবি, চক্রটি বেশ পরিকল্পিতভাবে চুরি করত। কোনো এলাকায় বড় ধরনের চুরি করার আগে তারা কয়েক মাস ধরে ওই এলাকার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও যাতায়াতের পথ পর্যবেক্ষণ করত। চুরির পর দ্রুত এলাকা পরিবর্তন করে আত্মগোপনে চলে যেত তারা। বছরে এক থেকে দুটি বড় ধরনের চুরিতে জড়িত থাকার তথ্যও পেয়েছে পুলিশ।
গত ১৯ জুন ভোরে সাহেববাজারের স্বর্ণপট্টিতে ‘কারূশ্রী জুয়েলার্স’-এ চুরির ঘটনা ঘটে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অজ্ঞাতনামা ১০ থেকে ১২ জনের একটি দল দোকানের সামনে বিভিন্ন পণ্য বিক্রির দোকান বসিয়ে কৌশলে জটলা তৈরি করে। পরে তারা পাশের স্বর্ণের দোকানের তালা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে। একপর্যায়ে কারূশ্রী জুয়েলার্সের পশ্চিম পাশের দেয়াল কেটে দোকানে ঢুকে সিন্দুক ভেঙে স্বর্ণ, রুপা ও নগদ টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়।
দোকানের মালিক তুর্য সরকার বাদী হয়ে বোয়ালিয়া মডেল থানায় মামলা করেন। চুরি যাওয়া মালামালের মধ্যে ছিল আনুমানিক ২০০ ভরি স্বর্ণ, ১ হাজার ২০০ ভরি রুপা, তিন বক্স স্বর্ণের নাকফুল এবং নগদ ২০ লাখ টাকা। ঘটনার পর মামলাটি তদন্তের জন্য ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়। এরপর আরএমপির ডিবি, সাইবার ইউনিট ও সিসি ক্যামেরা ইউনিট যৌথভাবে কাজ শুরু করে। তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে চক্রটির সদস্যদের শনাক্ত করা হয়।
পুলিশ বলছে, চক্রটির সদস্যরা অত্যন্ত কৌশলী। তারা একটি মোবাইল ফোন একবারের বেশি ব্যবহার করত না। এমনকি ব্যবহৃত সিমকার্ডগুলোও অন্য ব্যক্তিদের নামে নিবন্ধিত ছিল। ফলে তাদের প্রকৃত পরিচয় ও অবস্থান শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ত। চুরির পর তারা দ্রুত স্থান পরিবর্তন করত এবং কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় দীর্ঘদিন অবস্থান করত না। তদন্তে আরও জানা যায়, কারূশ্রী জুয়েলার্সে চুরির প্রায় চার মাস আগে চক্রটির সদস্যরা রাজশাহীতে এসে বিভিন্ন হোটেলে অবস্থান করে। ব্যবসার আড়ালে তারা স্বর্ণের দোকানসহ আশপাশের এলাকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে। একই সঙ্গে চুরি সংঘটনের পাশাপাশি নিরাপদে পালিয়ে যাওয়ার পথও ঠিক করে নেয়। তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে গত পরশু রাতে বাগেরহাটের মোংলা থানার শেহলাবুনিয়া মোর্শেদ সড়ক গ্রামের ফজলুল হকের ছেলে রুস্তম আলী শেখকে (৬৪) খুলনা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
অন্যদিকে পুলিশের পৃথক দল ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া থানার মাধবপুরা (মাইল্যারহাট) গ্রামের আবদুল হাকিমের ছেলে স্বপন (৬২), একই গ্রামের মানিক ফকিরের ছেলে উজ্জল (৩৭), একই এলাকার মতি ফকিরের ছেলে রিয়াজ ওরফে সুমন ওরফে সুজন ওরফে গেদু (৩৯), বাগেরহাটের শরনখোলা থানার খোন্তাকাটা গ্রামের মোসাকের ছেলে আবু তালেব (৪৫), একই থানার পূর্ব খোন্তাকাটা গ্রামের শেখ ফজলু শেখের ছেলে কালাম শেখ (৪৮) এবং পিরোজপুরের ভান্ডারিয়ার মাধবপুরা গ্রামের আবদুল হাকিমের ছেলে ইউনুসকে (৪৫) গ্রেপ্তার করা হয়।
তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চোরাই মালামাল কেনার সঙ্গে জড়িত অভিযোগে স্বর্ণ ব্যবসায়ী রবিউল হাসানকে (৪৫) ঢাকার একটি এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি চাঁদপুরের কচুয়া থানার সরকার বাড়ি বজনীখোলা গ্রামের রফিজ উদ্দিনের ছেলে।
পুলিশের দাবি, রবিউল হাসানের হেফাজত থেকে চুরি যাওয়া ২৬ ভরি স্বর্ণ, ৬২ ভরি রুপা এবং চোরাই স্বর্ণ বিক্রির ২৫ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। পরে অসুস্থ হয়ে পড়লে পুলিশ পাহারায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
রাজশাহী মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চুরি যাওয়া বাকি মালামাল উদ্ধারে অভিযান চলছে। একই সঙ্গে চক্রটির সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। গ্রেপ্তার আটজনকে আজ আদালতে হাজির করে প্রত্যেকের সাত দিনের রিমান্ড চাওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।




