রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) এক শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে আনসার সদস্যদের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী আসিফের অভিযোগ, স্টেশন থেকে বের হওয়ার সময় তাঁকে পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে কলার ধরে টানাটানি করা হয়। পরে কয়েকজন মিলে তাঁকে মারধর করে একটি কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বুট পরা অবস্থায় লাথি ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করা হয়েছে বলেও দাবি তাঁর।
আসিফ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী এবং শামসুজ্জোহা হলের আবাসিক শিক্ষার্থী।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) রাতে রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে কী ঘটেছিল—এ বিষয়ে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে এসব অভিযোগ করেন তিনি।
আসিফ জানান, তাঁর ভাইয়ের অপারেশন শেষ হওয়ার পর পরদিন ক্লাস থাকায় তাঁকে জরুরি ভিত্তিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ফিরতে হচ্ছিল। এর আগে থেকেই তিনি ট্রেনের টিকিটের খোঁজ করছিলেন। টিকিট কাউন্টারে গিয়ে জানতে পারেন, কোনো স্ট্যান্ডিং টিকিটও পাওয়া যাচ্ছে না।
পরে এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা হলে জানতে পারেন, তাঁর কাছে একটি স্ট্যান্ডিং টিকিট রয়েছে। ক্যাম্পাসে ফেরার প্রয়োজন থাকায় বন্ধুর সঙ্গে কথা বলে ওই টিকিটের মাধ্যমে তিনি যাত্রা করেন।
আসিফের ভাষ্য, রাজশাহী রেলস্টেশনে পৌঁছানোর পর তিনি স্টেশন থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। প্রথমে কোনো আনসার সদস্য তাঁকে কিছু বলেননি। গেট পার হয়ে যাওয়ার পর কয়েকজন আনসার সদস্য তাঁকে ডাকতে থাকেন।
তিনি বলেন, “আমি গেট দিয়ে বের হয়ে যাওয়ার পর আনসার সদস্যরা আমাকে কয়েকবার ডাকেন। কিন্তু ততক্ষণে আমি গেট পার হয়ে চলে যাচ্ছিলাম। আমার বন্ধু তখন আমাকে ডাকছিল এবং টেক্সটও করছিল।”
আসিফ অভিযোগ করেন, পরে একজন আনসার সদস্য পেছন থেকে তাঁকে ধাক্কা দিয়ে বলেন, “ডাকছি—শুনতে পাচ্ছ না কেন?” এরপর তাঁকে পাশে নিয়ে কলার ধরে টানাটানি করেন।
তখন প্রতিবাদ করে আসিফ বলেন, “আপনি স্যার হন বা যে-ই হন, আমার গায়ে হাত দেওয়ার অধিকার আপনার নেই।”
তাঁর দাবি, ওই আনসার সদস্য তাঁকে চাকরি চলে যাওয়ার হুমকি দেন এবং কলার ধরে টানাটানি করতে থাকেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করেন তিনি। এ সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে তাঁর হাত ওই ব্যক্তির কলারে লাগে বলেও জানান আসিফ। তবে তাঁকে আঘাত করার কোনো উদ্দেশ্য ছিল না বলে দাবি করেন তিনি।
এরপর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বলে জানান আসিফ। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই আনসার সদস্য আরও কয়েকজনকে নিয়ে তাঁদের দিকে এগিয়ে আসেন। প্ল্যাটফর্মের ভেতরে নেওয়ার সময় ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়। পরে আরও কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তি সেখানে যোগ দেন এবং একপর্যায়ে তাঁদের মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মারধরের বর্ণনা দিয়ে আসিফ বলেন, “আমার শার্ট ছিঁড়ে যায়, ব্যাগ ছিঁড়ে যায়। এরপর আমি মাটিতে পড়ে যাই। তখন তিনজন আমাকে ধরে টেনে স্টেশনের একটি কক্ষে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। একজন সামনে, একজন পেছনে এবং আরেকজন আমার কলার ধরে টানছিল।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ওই কক্ষে যেতে রাজি না হওয়ায় তাঁকে ফেলে মারধর করা হয় এবং লাথি মারা হয়। একপর্যায়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে দুইজন তাঁকে একটি হাজতসদৃশ কক্ষে নিয়ে যায়।
আসিফের দাবি, ওই কক্ষেও তাঁকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। তিনি বলেন, “সেখানেও আমাকে বুট পরা অবস্থায় লাথি ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করা হয়। আমার কাছে থাকা ফোনও নিয়ে নেওয়া হয়। এ সময় আমাদের সঙ্গে গালাগাল ও দুর্ব্যবহার করা হয়।”
পরে কয়েকজন সাংবাদিক ঘটনাস্থলে এসে বিষয়টি জানতে পারেন বলে জানান আসিফ। সাংবাদিকরা তাঁদের বের করে দেওয়ার কথা বলার পর তাঁরা সেখান থেকে বের হতে সক্ষম হন বলে দাবি করেন তিনি।
নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি
ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করে আসিফ বলেন, “আমি শুধু চাই, পুরো ঘটনাটি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক। আমি কীভাবে সেখানে গিয়েছিলাম, টিকিটের বিষয়টি কী ছিল, এরপর কীভাবে আমাকে ধাক্কা দেওয়া ও কলার ধরা হলো এবং পরে কীভাবে মারধরের ঘটনা ঘটল—সবকিছু তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া দরকার।”
এদিকে, শিক্ষার্থী আসিফের করা অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আনসার সদস্য বা রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমান বলেন, “আমাদের শিক্ষার্থীরা ঘরে ফিরে এসেছে। কেন এমন হয়েছে, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কোথায় ঘাটতি ছিল—এগুলো খুঁজলেই পাওয়া যাবে।”
তিনি জানান, আপাতত পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে।








