রাবি রিপোর্টার: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের প্রায় চার হাজার নবীন শিক্ষার্থীকে বরণ করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের বিশ্ববিদ্যালয় শাখা। ‘নবীনবরণ ও ক্যারিয়ার গাইডলাইন’ শীর্ষক এ আয়োজনে নবীনদের ফুল, কুরআন, কলমদানি ও অনুপ্রেরণামূলক বইসহ বিভিন্ন উপহার দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে দেশের রাজনীতি, শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ, শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ নিয়ে বক্তব্য দেন অতিথিরা।

শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ৮টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। নবীন শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিতে মিলনায়তন কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। পূর্বনির্ধারিত গুগল ফর্মের মাধ্যমে নিবন্ধন করে শিক্ষার্থীরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের (রুয়া) সভাপতি মাওলানা রফিকুল ইসলাম খাঁন। প্রধান আলোচক ছিলেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম। সভাপতিত্ব করেন রাবি শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মুজাহিদ ফয়সাল। সঞ্চালনা করেন শাখা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি মেহেদী হাসান।

‘আগের মতো গুম-খুনের রাজনীতি করতে চায়’

প্রধান অতিথির বক্তব্যে মাওলানা রফিকুল ইসলাম খাঁন বলেন, বাংলাদেশকে এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে এগিয়ে নিতে হবে, যেখানে আর কোনো স্বৈরাচারের জন্ম হবে না। তিনি অভিযোগ করেন, বিএনপি আগের মতোই দেশে গুম-খুনের রাজনীতি করতে চায়।

গুম-খুনের অভিযোগ তদন্তের বিধান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় সংসদে ১৩৩টি অধ্যাদেশ আনা হয়েছিল। এর মধ্যে ২০টি বাতিল করা হয়েছে, যার একটি ছিল গুম-খুন কমিশন। গুম-খুনের অভিযোগের ক্ষেত্রে অভিযুক্ত সংস্থাকে দিয়ে তদন্ত না করার যে বিধান ছিল, তা পরিবর্তন করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘পুলিশ গুম করবে, খুন করবে, আবার অভিযোগের তদন্তও করবে—এটা কীভাবে সম্ভব? কোনো অভিযোগকারী অভিযোগ প্রমাণ করতে না পারলে পাঁচ বছর পর্যন্ত সাজার বিধান রাখা হয়েছে। তাহলে মানুষ অভিযোগ করতে যাবে কীভাবে?’

মাওলানা রফিকুল ইসলাম আরও বলেন, ‘এই বাংলাদেশ কোনো পরিবারের বাংলাদেশ নয়। এই বাংলাদেশ ২০ কোটি মানুষের বাংলাদেশ।’ দেশের জনগণই রাষ্ট্র কীভাবে পরিচালিত হবে তা নির্ধারণ করবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কেউ এর ব্যত্যয় ঘটানোর চেষ্টা করলে জনগণ ও ছাত্রসমাজ ঐক্যবদ্ধভাবে তার বিরুদ্ধে দাঁড়াবে।

‘শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাসের সংস্কৃতি ফিরতে দেওয়া যাবে না’

শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ নিয়ে মাওলানা রফিকুল ইসলাম বলেন, গত ১৬ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গেস্টরুম, টর্চার সেল, গণরুম, চাঁদাবাজি ও মাদক সংস্কৃতি সাধারণ শিক্ষার্থীদের অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে শিক্ষাঙ্গনে পরিবর্তন এসেছে। তবে এ পরিবর্তনকে ধ্বংস করতে অনেকে ষড়যন্ত্র করছে।

তিনি বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আদর্শ, সৎ ও যোগ্য মানুষ তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে শুধু ডিগ্রি দেওয়ার প্রতিষ্ঠান নয়, মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

বর্তমান সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে তিনি বিভিন্ন ক্ষেত্রে দলীয়করণের অভিযোগ তোলেন। তার মতে, এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে স্বৈরাচারী শাসনের পুনরাবৃত্তি না ঘটে।

‘এখন থেকেই ভবিষ্যতের লক্ষ্য ঠিক করতে হবে’

প্রধান আলোচকের বক্তব্যে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম নবীন শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের যোগ্য করে গড়ে তোলার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যতে নিজেকে কোথায় দেখতে চাও, এখন থেকেই সেই লক্ষ্য ঠিক করতে হবে। নিজের অধ্যয়নরত বিষয়ে গভীর ধারণা রাখতে হবে।’ বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের নতুন স্বপ্নগুলো যেন নষ্ট না হয়, সেদিকে শিক্ষার্থীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।

তিনি বলেন, একটি নতুন প্রজন্ম গড়ে তুলতে হবে, যারা ভবিষ্যতে দেশের সেবায় নিজেদের সর্বোচ্চ নিয়োজিত করবে। মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে দেশ গড়ে তুলতে হবে।

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরে নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, শিক্ষিত যুবকদের যথাযথভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে না। ফলে অনেকে দেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পর কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। শিক্ষা ব্যবস্থাকে দলীয়করণ থেকে বের করে আনার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

দুই বছরের মধ্যে শতভাগ আবাসনের দাবি

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন সংকট নিয়েও কথা বলেন ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের ভর্তি নিশ্চিত হলেও তাদের আবাসনের নিশ্চয়তা দিতে পারছে না বিশ্ববিদ্যালয়।

তার দাবি, রাবিতে প্রায় ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থী হলে থাকার সুযোগ পেলেও প্রায় ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থীকে হলের বাইরে থাকতে হচ্ছে। আগামী দুই বছরের মধ্যে শতভাগ শিক্ষার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

‘গুণ ও নৈতিকতার দিক থেকে বড় হতে হবে’

রাকসুর সহ-সভাপতি (ভিপি) মোস্তাকুর রহমান জাহিদ নবীনদের উদ্দেশে বলেন, শুধু শারীরিকভাবে বড় হওয়া নয়, গুণ ও নৈতিকতার দিক থেকে বড় হওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, বড় মনীষীদের আদর্শ অনুসরণের ক্ষেত্রে তাদের বক্তব্যের পাশাপাশি বাস্তব জীবনের কর্মকাণ্ডও বিবেচনা করা প্রয়োজন। এতে শিক্ষার্থীরা সঠিক আদর্শ বেছে নিতে পারবে।

‘সঠিক পথ বেছে নিতে হবে’

সভাপতির বক্তব্যে রাবি শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মুজাহিদ ফয়সাল বলেন, কঠিন ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে নবীন শিক্ষার্থীরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ভালো ও খারাপ—দুই ধরনের পথই রয়েছে। শিক্ষার্থীদের সঠিক পথ বেছে নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে ইসলামী ছাত্রশিবির সবসময় পাশে থাকবে। দুই হাজার শহীদের রক্তের বিনিময়ে যে কোটা প্রথার কবর দেওয়া হয়েছে, তা আর কখনো ফিরে আসতে দেওয়া হবে না।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল, সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ, রাবি শাখা ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি ইমাজ উদ্দিন মন্ডল, রাজশাহী মহানগর শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি ইমরান নাজীর, ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় বিজ্ঞান সম্পাদক মু. মাহমুদুল হাসান, শাখা ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মী, আমন্ত্রিত অতিথি ও নবীন শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা।