সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারসহ নানা দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ তুলেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের অভিযোগে অর্থ পাচারের পাশাপাশি নিয়োগ, পদায়ন, টেন্ডার বাণিজ্য, উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি ও ঘুষ লেনদেনের মতো বিষয়ও উঠে এসেছে।

বিদেশে পাচারের অভিযোগ

দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, আসিফ মাহমুদ বিপুল পরিমাণ অর্থ দুবাই, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া ও সুইজারল্যান্ডে পাচার করেছেন। এর মধ্যে দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি এবং সুইজারল্যান্ডে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, এসব অর্থ দিয়ে বিদেশে বিলাসবহুল ভিলা কেনা ও বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয়েছে। পাশাপাশি পর্তুগালে জমি কেনা, দুবাইয়ের গ্রিন গ্রুপে বিনিয়োগ এবং সুইস ব্যাংকে অর্থ জমা রাখার অভিযোগও রয়েছে।

নিয়োগ ও টেন্ডারে অর্থ লেনদেন

দুদকের অভিযোগে বলা হয়েছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগে প্রায় ৬০ কোটি টাকা এবং দেশের ৩৬ জন জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদায়নে ২ থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেনের সঙ্গে আসিফের সম্পৃক্ততা ছিল।

এ ছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের টেন্ডার বাণিজ্য এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার থেকে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ কমিশন নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের টেন্ডার বাণিজ্যেও তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ করেছে দুদক।

উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় বাড়ানোর অভিযোগ

অভিযোগে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপে অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়ানোর অভিযোগও রয়েছে।

ঘুষ ও নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ

দুদকের অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে কোটি কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আব্দুস সালামকে নিয়োগ দিয়ে ১০ কোটি টাকা উৎকোচ গ্রহণের অভিযোগ করা হয়েছে।

এ ছাড়া এলজিইডির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুর রশীদ খানকে ৫২ কোটি টাকা ঘুষের বিনিময়ে নিয়োগ এবং ৬৫ কোটি টাকার বিনিময়ে গাজীপুর সিটি করপোরেশনে আব্দুল লতিফ খানকে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

পরিবারের সদস্য ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ

দুদকের অভিযোগে বলা হয়েছে, আসিফের দুই বোনজামাই ও ভাগ্নের মাধ্যমে বিদেশে কোটি কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে। তার নিজ উপজেলা মুরাদনগরের গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ৪৫৩ কোটি টাকা বরাদ্দের বিষয়টিও প্রশ্নবিদ্ধ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগে আসিফের বাবা বিল্লাল হোসেন ও এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে ঠিকাদারদের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় প্রশাসনের ওপর প্রভাব খাটিয়ে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ করা হয়েছে। পাশাপাশি তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিও) মাহফুজুল আলম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধেও ঘুষ লেনদেনে তদবির ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধান চলছে

এ ছাড়া হেলিকপ্টারে ভ্রমণের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়, পাঁচ তারকা হোটেলে নিয়মিত যাতায়াত, বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও গাড়ি ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে।

দুদক জানিয়েছে, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ওঠা এসব দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান চলমান রয়েছে।