কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মডেল প্রশিক্ষণে ইন্টারনেট থেকে বিপুল পরিমাণ তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়াকে ‘মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শ্রম চুরি’ হিসেবে মন্তব্য করেছেন মাইক্রোসফটের ফলিত বিজ্ঞান বিভাগের পরিচালক ব্রেন্ট হেখট। তাঁর আশঙ্কা, এভাবে সংবাদমাধ্যম ও কনটেন্ট নির্মাতাদের তৈরি কাজ ব্যবহার করা হলে তাদের জন্য একটি ‘পতনমুখী চক্র’ তৈরি হতে পারে।

সম্প্রতি প্রকাশ্যে আসা আদালতের কিছু নথিতে এসব মন্তব্য উঠে এসেছে। ২০২৩ সালে ওপেনএআই ও মাইক্রোসফটের বিরুদ্ধে কপিরাইট লঙ্ঘনের অভিযোগে মামলা করে নিউ ইয়র্ক টাইমস। ওই মামলার অংশ হিসেবে আদালতের নির্দেশে কিছু অভ্যন্তরীণ নথি প্রকাশ করা হয়েছে। তবে নথিগুলোর সব অংশ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।

পেওয়াল পেরিয়ে কনটেন্ট সংগ্রহের অভিযোগ

নিউ ইয়র্ক টাইমসের অভিযোগ, এআই মডেল প্রশিক্ষণের জন্য সংবাদ নিবন্ধসহ বিপুল পরিমাণ কপিরাইট সুরক্ষিত কনটেন্ট অনুমতি বা আর্থিক ক্ষতিপূরণ ছাড়াই সংগ্রহ করা হয়েছে।

প্রকাশিত নথিতে পেওয়াল-সুরক্ষিত কনটেন্টে প্রবেশের উপায় নিয়ে অভ্যন্তরীণ আলোচনার কথাও উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, বিপুল পরিমাণ ডেটা ব্যবহার করে প্রশিক্ষণভিত্তিক ডেটাসেট তৈরির সময় কিছু কনটেন্ট থেকে কপিরাইট-সংক্রান্ত নোটিশও সরিয়ে ফেলা হয়েছিল।

এখানেই মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—অনুমতি ছাড়া সংবাদ ও অন্যান্য কপিরাইট সুরক্ষিত কাজ এআই প্রশিক্ষণে ব্যবহার করা হলে তা যুক্তরাষ্ট্রের ‘ফেয়ার ইউজ’ আইনের আওতায় পড়বে কি না।

সংবাদমাধ্যমের জন্য ‘অস্তিত্বগত হুমকি’

বিষয়টি নিয়ে শুধু মাইক্রোসফটের মধ্যেই উদ্বেগ ছিল না। ওপেনএআইয়ের নির্বাহী নিক টার্লিও এআইভিত্তিক পণ্যকে সংবাদ প্রকাশকদের জন্য ‘অস্তিত্বগত হুমকি’ হিসেবে দেখেছিলেন বলে আদালতের নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

কারণ, পাঠক যদি এআইয়ের কাছ থেকেই সরাসরি কোনো খবর বা তথ্য পেয়ে যান, তাহলে মূল সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইটে গিয়ে প্রতিবেদন পড়ার প্রয়োজন কমে যেতে পারে।

অভ্যন্তরীণ আলোচনায় ওপেনএআইয়ের একজন প্রকৌশলীও আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, এআইয়ের উত্তরে সংবাদমাধ্যমের লিংক দেওয়া হলেও ব্যবহারকারীরা সেগুলোতে ক্লিক নাও করতে পারেন। ফলে যে সংবাদ ও তথ্য এআইকে আরও কার্যকর করে তুলছে, সেই প্রযুক্তিই আবার সংবাদমাধ্যমের পাঠক ও আয় কমিয়ে দিতে পারে।

মাইক্রোসফটের অভ্যন্তরীণ নথিতেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল, এআই যদি মানুষের তৈরি কনটেন্টের ওপর ক্রমেই বেশি নির্ভর করে অথচ সেই কনটেন্ট তৈরির প্রতিষ্ঠানগুলো আয় হারাতে থাকে, তাহলে একসময় নতুন কনটেন্টের সরবরাহ কমে যেতে পারে।

মাইক্রোসফটের বক্তব্য

অভ্যন্তরীণ নথিতে থাকা এসব মন্তব্যকে কোম্পানির আনুষ্ঠানিক অবস্থান হিসেবে দেখছে না মাইক্রোসফট। কোম্পানিটির দাবি, এআই প্রযুক্তিতে কপিরাইট সুরক্ষিত কনটেন্টের ব্যবহার আইনসম্মত এবং তাদের ‘কোপাইলট’ সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকতার বিকল্প নয়।

তবে আদালতের নথিতে উঠে আসা এসব মন্তব্য এআই ও সংবাদমাধ্যমের দীর্ঘদিনের বিরোধকে নতুন করে সামনে এনেছে। এআই মডেল প্রশিক্ষণে সংবাদ, বই, ছবি ও অন্যান্য কপিরাইট সুরক্ষিত কাজ কতটা ব্যবহার করা যাবে, তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এখনো আইনি লড়াই চলছে।

নিউ ইয়র্ক টাইমসের মামলার ফল শুধু সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যই নয়, ভবিষ্যতে এআই কোম্পানি ও কনটেন্ট নির্মাতাদের সম্পর্ক কোন পথে এগোবে, সেটির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।