রাজশাহী মহানগরীর সৌন্দর্যবর্ধন ও সড়ক উন্নয়নে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেসব অবকাঠামোই এখন ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠছে। নগরীর বিভিন্ন সড়কের পাশের ড্রেন থেকে একের পর এক স্ল্যাব ও লোহার ফ্রেম চুরি হয়ে যাচ্ছে। ফলে ফুটপাত সংকুচিত হয়ে পথচারীদের নামতে হচ্ছে ব্যস্ত সড়কে আবার অসতর্ক হলেই খোলা ড্রেনে পড়ে ঘটছে দুর্ঘটনা। আর নিরাপদ ফুটপাত এখন নগরবাসীর কাছে আতঙ্কের অপর নাম হয়ে উঠেছে।

সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র ছিলো নগরীর বন্ধগেট থেকে সিটি হাট পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার সড়কে। সেখানে নির্মিত ড্রেনের মোট ৫৭৫টি স্ল্যাবের মধ্যে ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে ৫’শ টির বেশি স্ল্যাব চুরি যাওয়ার তথ্য উঠে আসে। ওই সময় রাসিকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীও স্ল্যাব চুরির বিষয়টি স্বীকার করে মামলা বা সাধারণ ডায়েরির উদ্যোগের কথা জানিয়েছিলেন। এরপরও পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি। বরং নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ড্রেনের স্ল্যাব ও ফ্রেম চুরি হচ্ছে দেদাশে। নগরীর বারো রাস্তা থেকে বিমানচত্তর, বড়বনগ্রাম থেকে বিহাস সর্বত্রই একই অবস্থা।

নগরীর নতুন ও প্রশস্ত সড়কগুলোর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় চলাচল নিশ্চিত করা। কিন্তু ড্রেনের ঢাকনা উধাও হয়ে যাওয়ায় অনেক এলাকায় ফুটপাত আর পথচারীবান্ধব থাকছে না। দিনের বেলায় খোলা ড্রেন কোনোভাবে এড়িয়ে চলা সম্ভব হলেও রাতে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে শিশু, নারী, বয়স্ক মানুষ ও শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। ফুটপাতের জায়গায় ড্রেন খোলা থাকায় অনেককে মূল সড়ক দিয়ে হাঁটতে হচ্ছে। এতে পথচারী ও যানবাহনের সংঘর্ষের ঘটনাও বেড়েছে আশঙ্কাজনক ভাবে।

২০২১ সালে বন্ধগেট থেকে সিটি হাট সড়কটি চার লেনে উন্নীত করতে রাজশাহী মহানগরীর সমন্বিত নগর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় কাজ শুরু হয়। প্রকল্পের আওতায় সড়ক, ড্রেন, ফুটপাত, ডিভাইডার ও আলোকায়নের ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু নির্মাণের পর সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ কতটা কার্যকর হয়েছে, স্ল্যাব চুরির ঘটনা সেই প্রশ্ন সামনে এনেছে। একটি স্ল্যাব চুরি যাওয়ার পর দ্রুত নতুন স্ল্যাব বসানো হয়নি। ফলে এক জায়গা থেকে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে দীর্ঘ অংশজুড়ে স্ল্যাব উধাও হয়েছে। অথচ একটি স্ল্যাব খুলতে সময় লাগে। তা বহন করে নিয়ে যেতে হয়। এরপর ভাঙারি হিসেবে বিক্রিও করতে হয়। তথ্যমতে, ড্রেনের স্ল্যাব চুরি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং দীর্ঘদিন ধরে সংঘবদ্ধভাবে এগুলো সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে রাতের আঁধারে স্ল্যাব খুলে নিয়ে যাওয়া হলেও কার্যকর নজরদারি নেই। কোথাও আবার রিকশা বা মোটরসাইকেলে করে স্ল্যাবের ফ্রেম নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। জানাগেছে, চুরি যাওয়া এসব স্ল্যাবের লোহার অংশ ভাঙারি হিসেবে বিক্রি হচ্ছে।

এদিকে ড্রেনের স্ল্যাব চুরি শুধু পথচারীর নিরাপত্তা নয়, নগরীর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। খোলা ড্রেনে ময়লা-আবর্জনা পড়ছে। এতে ড্রেনের পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি দুর্গন্ধ ও পরিবেশগত সমস্যাও তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে বর্ষার সময় পানিতে ড্রেন ও সড়কের পার্থক্য বোঝা কঠিন হয়ে যায়। তখন খোলা ড্রেন আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে।

ড্রেনের স্ল্যাব চুরির বিষয়ে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের জবাবদিহি নিশ্চিতের দাবি জানান নগরবাসী। স্ল্যাব চুরির ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে গত কয়েক বছরে রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায় মোট কতটি ড্রেন স্ল্যাব চুরি হয়েছে, এর আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ কত, কতটি ঘটনায় মামলা বা জিডি হয়েছে এবং কতটি স্ল্যাব পুনঃস্থাপন করা হয়েছে এসব তথ্য কি রাসিকের কাছে রয়েছে? যদিও কিছু জায়গাতে রাসিক সিমেন্ট ঢালাইকৃত কিছু স্ল্যাব বসিয়েছে। কিন্তু এতে কওে ফুটপাতের মূল সৌন্দর্য হারিয়ে গেছে। নগরবাসী শুধু চুরি যাওয়ার পর নতুন স্ল্যাব বসানো নয়, চুরির উৎস বন্ধ করাও আহ্বান জানান। একই সাথে অতিদ্রুত নগরজুড়ে ড্রেন স্ল্যাবের পূর্ণাঙ্গ জরিপ, চুরি যাওয়া স্ল্যাবের তালিকা প্রকাশ, দ্রুত পুনঃস্থাপন এবং চক্রটি শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার জন্য সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষন করেন।